‘জাভান’ হোটেল ঘিরে মাদক, দেহব্যবসা, সন্ত্রাস ও রহস্যজনক বিস্ফোরণে আতঙ্কিত জনপদ
নিজস্ব প্রতিবেদক:
শিল্পনগরী টঙ্গীর প্রাণকেন্দ্রে যেন নীরবে গড়ে উঠেছে অপরাধের এক ভয়ংকর অভয়ারণ্য। স্থানীয়দের কাছে বহুদিন ধরেই আতঙ্কের নাম কথিত আবাসিক “জাভান” হোটেল। অভিযোগ উঠেছে, দিনের আলো ফুরাতেই হোটেলটি পরিণত হয় মাদক ব্যবসায়ী, দেহব্যবসা চক্র, ছিনতাইকারী ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের নিরাপদ আস্তানায়। আর এর প্রভাব পড়ছে পুরো টঙ্গী এলাকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে।
এরই ধারাবাহিকতায় আজ বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সকাল আনুমানিক ৬টা ৩০ মিনিটের দিকে জাভান হোটেলে ঘটে নতুন চাঞ্চল্যকর ঘটনা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কাস্টমার ও হোটেল কর্তৃপক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে হঠাৎ বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে-এটি ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ ছিল নাকি গুলির শব্দ, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে রহস্য!
ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান জাতীয় সাপ্তাহিক মুক্ত বাংলা পত্রিকার সম্পাদক সরওয়ার জাহান মেঘলা। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ঘটনার বিষয়ে তথ্য জানার চেষ্টা করলে জাভান হোটেলের কথিত মালিক সায়মন ও তার সহযোগীরা তার সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন। এক পর্যায়ে তার হাত থেকে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হলে মোবাইল ফোনটি ভেঙে যায়। ঘটনাটি উপস্থিত লোকজনের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি করে।
এছাড়াও স্থানীয় একাধিক সংবাদকর্মী অভিযোগ করেন, জাভান হোটেলে দীর্ঘদিন ধরে চলমান অসামাজিক কর্মকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহ করতে গেলেই হোটেল সংশ্লিষ্টদের বাধা, হুমকি ও দুর্ব্যবহারের শিকার হতে হয়।
পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং বিকট শব্দের কারণ তদন্ত শুরু করে। তবে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি এটি ককটেল বিস্ফোরণ নাকি আগ্নেয়াস্ত্রের গুলির শব্দ ছিল।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, রাতভর জাভান হোটেলে চলে ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদকের বেচাকেনা ও সেবন। শুধু হোটেলের ভেতরেই নয়, আশপাশের এলাকাজুড়েও চলে প্রকাশ্যে মাদকের “পার্সেল” সরবরাহ। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মাদকসেবী ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের আনাগোনায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।
অভিযোগ রয়েছে, জাভান হোটেলকে কেন্দ্র করে টঙ্গীর আমতলী, স্টেশন রোড, কেরানিরটেক ও আশপাশের এলাকায় আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে চুরি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ও নানা ধরনের অপরাধ। স্থানীয়দের দাবি, এই হোটেল ও পাশের কেরানিরটেক বস্তিকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে শক্তিশালী মাদক সিন্ডিকেট।
বিশেষ করে কেরানিরটেক বস্তি দীর্ঘদিন ধরেই টঙ্গীর অন্যতম মাদকের হটস্পট হিসেবে পরিচিত। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেখানে প্রকাশ্যেই ইয়াবা ও গাঁজার বিক্রি চলে। সন্ধ্যা নামলেই বস্তির অলিগলি ভরে ওঠে মাদক কারবারি ও সেবনকারীদের পদচারণায়। আর সেই অপরাধচক্রের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবেই ব্যবহার হচ্ছে জাভান হোটেল।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সেনাবাহিনী, র্যাব, বিজিবি ও পুলিশের যৌথ অভিযানে জাভান হোটেল ও কেরানিরটেক বস্তিতে বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, গাঁজা, বিদেশি মদ, নগদ টাকা ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত শতাধিক নারী-পুরুষকে আটক করা হয়েছিল।
অনুসন্ধানে জানা যায়, অভিযানের পর কিছুদিন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বর্তমানে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে অপরাধচক্র। এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেটের ছত্রছায়ায় প্রকাশ্যেই চলছে এসব অপকর্ম। ফলে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারী ও শিক্ষার্থীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, টঙ্গীর মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে এমন একটি অপরাধকেন্দ্র টিকে থাকা শুধু আইন-শৃঙ্খলার জন্যই হুমকি নয়, বরং পুরো সমাজ ব্যবস্থার জন্য অশনিসংকেত। প্রতিদিন হাজার হাজার শ্রমিক, নারী কর্মী ও শিক্ষার্থীর চলাচলের এই এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক, সহিংসতা ও অসামাজিক কার্যকলাপ চললেও রহস্যজনক কারণে কার্যকর স্থায়ী ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না।
এলাকাবাসীর দাবি, জাভান হোটেল ও কেরানিরটেক বস্তিকে ঘিরে গড়ে ওঠা মাদক, সন্ত্রাস ও দেহব্যবসার সিন্ডিকেট চিহ্নিত করে স্থায়ীভাবে উচ্ছেদ করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত যৌথ অভিযান, কঠোর নজরদারি ও জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।
ঘটনার বিষয়ে টঙ্গী পূর্ব থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ মেহেদী হাসান পিপিএম সেবা তদন্ত রিপোর্ট কে বলেন আমি এমন একটি মৌখিক অভিযোগ পেয়েছি তদন্ত চলমান রয়েছে।
বিস্তারিত তথ্য পরবর্তীতে প্রকাশ করা হবে।