এম এ মমিন আনসারী:
বাংলার প্রাচীন ইতিহাস, সভ্যতা, আধ্যাত্মিকতা ও লোকজ সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র মহাস্থানগড় পরিণত হয়েছে লাখো মানুষের মিলনমেলায়। ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলাকে ঘিরে সকাল থেকেই বগুড়া ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে দর্শনার্থী, ভক্ত, সাধু-সন্ন্যাসী, বাউল শিল্পী ও পর্যটকদের ঢল নেমেছে ঐতিহাসিক এই জনপদে।
প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, মহাস্থানগড় বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন নগর সভ্যতার অন্যতম নিদর্শন। প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরোনো এই জনপদ একসময় প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন রাজ্যের রাজধানী ছিল। মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেন শাসনামলে এটি ছিল রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। এখান থেকে আবিষ্কৃত অসংখ্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন দেশের ইতিহাস গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ইতিহাসবিদদের মতে, মহাস্থানগড়ের বৈশাখী মেলার ইতিহাসও বহু পুরোনো। বাংলা নববর্ষ ও চৈত্রসংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে যুগ যুগ ধরে এখানে সাধু-সন্ন্যাসী, বাউল ও বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের সমাগম হয়ে আসছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি ধর্মীয় আয়োজনের গণ্ডি পেরিয়ে বিশাল লোকজ উৎসবে পরিণত হয়েছে।
মেলায় গ্রামীণ ঐতিহ্যের নানা উপকরণ যেমন- মাটির তৈজসপত্র, বাঁশ-বেতের সামগ্রী, লোকজ বাদ্যযন্ত্র, কাঠের খেলনা, মিষ্টান্ন, গ্রামীণ খাবার ও হস্তশিল্পের দোকান বসেছে। শিশু-কিশোরদের জন্য নাগরদোলা ও বিভিন্ন বিনোদনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ফলে মেলাটি এখন শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক আয়োজন নয়, বরং একটি বৃহৎ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবে রূপ নিয়েছে।
এবারের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ: ৩৩ কেজির বিশাল মোমবাতি:
এবারের বৈশাখী মেলার সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে দেশের সবচেয়ে বড় বলে দাবি করা একটি বিশাল মোমবাতি। প্রায় ৫ ফুট উচ্চতার এই মোমবাতিটির ওজন ৩৩ কেজি। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কয়েকজন সাধু মিলে প্রায় ২৬ হাজার টাকা ব্যয়ে এটি তৈরি করেছেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মহাস্থানগড় মাজার সংলগ্ন এলাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে মোমবাতিটি প্রজ্বালন করা হয়।
বিশাল এই মোমবাতিকে ঘিরে সকাল থেকেই উৎসুক দর্শনার্থীদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। অনেকে এটিকে ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক প্রতীক হিসেবে দেখছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, এটি লোকজ সংস্কৃতি ও ব্যতিক্রমী সৃজনশীলতার এক অনন্য নিদর্শন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
তবে মোমবাতি তৈরিতে ব্যয় হওয়া অর্থের উৎস নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের মতে, সাধু-সন্ন্যাসীদের অনুসারী ও ভক্তদের অনুদান, মানত এবং মেলায় আগত দর্শনার্থীদের সহায়তার মাধ্যমেই সাধারণত এ ধরনের আয়োজন পরিচালিত হয়ে থাকে। যদিও আয়োজকদের পক্ষ থেকে অর্থ সংগ্রহ বা ব্যয়ের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি।
নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা:
মেলাকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। মাঠে দায়িত্ব পালন করছেন পুলিশ, আনসার ও স্বেচ্ছাসেবক সদস্যরা। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসানো হয়েছে নজরদারি ব্যবস্থা।
সংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা:
বিশেষজ্ঞদের মতে, মহাস্থানগড়ের বৈশাখী মেলা শুধু একটি ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান নয়; এটি বাংলার হাজার বছরের ইতিহাস ও লোকজ সংস্কৃতির জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। একই সঙ্গে এই মেলা স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কারুশিল্পী ও ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাদের জন্য অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রতিবছর লাখো মানুষের সমাগমকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যটন ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
ইতিহাস, আধ্যাত্মিকতা, লোকজ সংস্কৃতি ও মানুষের আবেগ- সব মিলিয়ে মহাস্থানগড়-এর বৈশাখী মেলা আজও বাংলার ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে টিকে আছে।