স্টাফ রিপোর্টার মোঃ শহিদুল ইসলাম
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহরের নামোশংকরবাটী চৌকাপাড়া এলাকায় মরিয়ম বেগম (৫৫) নামের এক গৃহশিক্ষিকাকে কাঠের বাটাম দিয়ে আঘাত ও শ্বাসরোধ করে হত্যার পর বস্তাবন্দি লাশ গুমের চেষ্টার চাঞ্চল্যকর রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। এই ঘটনায় মূল পরিকল্পনাকারী ও হত্যাকারী মোছাম্মৎ সুমাইয়া আক্তার সুমিসহ (২৮) ৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
গ্রেফতারকৃত অন্য আসামিরা হলেন— সুমাইয়ার স্বামী মো. রুবেল হোসেন (৩৫), শ্বশুর মো. আনোয়ার হোসেন (৫৫) এবং স্বর্ণের দুল ক্রেতা শ্রী দীপক সাহা (৩৫)। আসামিদের মধ্যে মূল হোতা সুমাইয়া আক্তার সুমি ও স্বর্ণ ব্যবসায়ী দীপক সাহা বিজ্ঞ আদালতে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ১৯ মে ২০২৬ তারিখ ভোরে জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’ নম্বরে প্রাপ্ত সংবাদের ভিত্তিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানার এসআই মো. বেলাল হোসেন নামোশংকরবাটী চৌকাপাড়া এলাকার রুবেল হোসেনের বসতবাড়ি থেকে ভিকটিম মরিয়ম বেগমের বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করেন।
পরবর্তীতে নিহতের পরিবার ঘটনাস্থলে এসে লাশ শনাক্ত করে। লাশের শরীরে একাধিক গুরুতর আঘাতের চিহ্ন থাকায় ময়নাতদন্তের জন্য ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। এই ঘটনায় নিহতের পরিবার অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে সদর থানায় একটি হত্যা মামলা (মামলা নং-৪৪, তারিখ: ১৯/০৫/২০২৬) দায়ের করেন।
ঘটনার তদন্তে নেমে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস), অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (নবাবগঞ্জ সার্কেল) এবং সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি)-এর দিকনির্দেশনায় এসআই মো. বেলাল হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশের একটি চৌকস দল তথ্য-প্রযুক্তি ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করে নামোশংকরবাটী ও গোমস্তাপুর থানা এলাকা থেকে ঘটনার সাথে জড়িত ৪ আসামিকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।
যেভাবে ঘটেছিল এই নির্মম হত্যাকাণ্ড: পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে মূল আসামি সুমাইয়া আক্তার সুমি জানায়, নিহত মরিয়ম বেগম গত প্রায় ৫ বছর ধরে সুমাইয়ার মেয়েকে প্রাইভেট পড়াতেন। গত ১৮ মে সকাল আনুমানিক ৮টার দিকে মরিয়ম বেগম প্রতিদিনের মতো সুমাইয়ার বাড়িতে পড়াতে আসেন। একপর্যায়ে মরিয়ম বেগম তার ছেলের ল্যাপটপ কেনার জন্য সুমাইয়ার কাছে কিছু টাকা ধার চান। সুমাইয়া টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে মরিয়ম তার কানের স্বর্ণের দুল জোড়া বিক্রি করে টাকা এনে দিতে বলেন।
সুমাইয়া দুল জোড়া নিয়ে রাজারামপুর মাস্টারপাড়া এলাকার ছবি সাহার ছেলে শ্রী দীপক সাহার কাছে ১২,০০০ টাকায় বিক্রি করে এবং সেখান থেকে নিজের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ৫,০০০ টাকা খরচ করে ফেলে। ওই দিনই বিকেল আনুমানিক সাড়ে ৩টার দিকে মরিয়ম বেগম পুনরায় সুমাইয়ার বাড়িতে এসে দুল বিক্রির টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে না পারায় দুজনের মধ্যে প্রচণ্ড কথা-কাটাকাটি হয়।
কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে সুমাইয়া ঘরের ভেতরে থাকা একটি কাঠের বাটাম দিয়ে মরিয়ম বেগমের মাথায় ও শরীরে আঘাত করে গুরুতর জখম করে। মরিয়ম বেগম চিৎকার করতে গেলে সুমাইয়া তার মুখ চেপে ধরে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। হত্যাকাণ্ড নিশ্চিত করার পর সুমাইয়া লাশটি খাটের ওপর থাকা রেক্সিন দিয়ে পেঁচিয়ে প্রথমে খাটের নিচে লুকিয়ে রাখে। পরে গভীর রাতে খাটের নিচ থেকে বের করে দুটি চটের বস্তায় ভরে পাশের লাকড়ি রাখার ঘরের পাশে পুরনো কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখে। রাতে সুমাইয়া বিষয়টি তার স্বামী রুবেল ও শ্বশুর আনোয়ার হোসেনকে জানালে তারা লাশ গুমের গোপন সহায়তার চেষ্টা করে।
আজ বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালত (সদর), চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিচারক মো. আশরাফুল ইসলামের আদালতে আসামি সুমাইয়া আক্তার সুমি ও দীপক সাহা ফৌজদারি কার্যবিধি ১৬৪ ধারায় হত্যাকাণ্ডের সত্যতা স্বীকার করে জবানবন্দি প্রদান করেছেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মো. বেলাল হোসেন জানান, মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলমান আছে।