
নিজস্ব প্রতিবেদক:
প্রবাসী বাংলাদেশিরা আমাদের অর্থনীতির অদৃশ্য স্তম্ভ। তাদের ঘাম, ত্যাগ আর দীর্ঘদিনের কষ্টের ওপর দাঁড়িয়ে আছে দেশের রেমিটেন্স প্রবাহ, যা প্রতিনিয়ত দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছে। কিন্তু এই সত্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর বেদনা—একটি নিঃশব্দ আর্তনাদ, যা খুব কমই আমরা শুনতে পাই।
অ্যাডভোকেট এ এন এম ঈসার ভাষায়, “প্রবাসী রেমিটেন্স যোদ্ধারা এখন চারটা ডাল-ভাত খেয়ে মরার নিশ্চয়তা চায়।” এই কথাটি শুধু আবেগ নয়—এটি বাস্তবতার নির্মম প্রতিফলন।
একজন প্রবাসী সাধারণত ২৫-৩০ বছর ধরে বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করেন। নির্মাণ শ্রমিক, ড্রাইভার, রেস্টুরেন্ট কর্মী কিংবা ক্লিনার—যে কাজই হোক, প্রতিটি দিনই তাদের জন্য সংগ্রামের।
তারা নিজেদের চাহিদা সীমিত করে দেশে টাকা পাঠান—পরিবারের জন্য, সন্তানদের পড়াশোনার জন্য, ঘরবাড়ি করার জন্য।
ধরুন, একজন প্রবাসী ৩০ বছর পর দেশে ফিরলেন।
তিনি আশা করেছিলেন—পরিবার তাকে ঘিরে থাকবে, সন্তানরা পাশে থাকবে, একটি শান্তিপূর্ণ জীবন কাটাবেন।
কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় ভিন্ন হয়—
ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে নিজেদের মতো সংসার গড়ে ফেলেছে
বাবা-মায়ের সঙ্গে আবেগিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে
স্ত্রী অনেক ক্ষেত্রে আলাদা হয়ে গেছে বা সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়েছে
কেউ কেউ দেখেন, নিজের ঘরেও তিনি যেন অতিথি
মোঃ করিম (ছদ্মনাম), সৌদি আরবে ২৮ বছর কাজ করেছেন।
প্রতি মাসে টাকা পাঠিয়েছেন—বাড়ি হয়েছে, ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করেছে।
দেশে ফিরে দেখলেন—
ছেলে বিয়ে করে আলাদা থাকে, মেয়ে নিজের সংসারে ব্যস্ত। স্ত্রীও অনেকটা দূরে সরে গেছে।
নিজের জন্য কোনো সঞ্চয় নেই।
শেষে তিনি বলেন,
“আমি যদি জানতাম, নিজের জন্য কিছুই থাকবে না—তাহলে অন্তত একটু সঞ্চয় করতাম। এখন শুধু দুই বেলা ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে থাকাই বড় চ্যালেঞ্জ।”
আব্দুল হাকিম (ছদ্মনাম), মালয়েশিয়ায় ২৫ বছর ছিলেন।
তার পাঠানো টাকায় জমি কেনা হয়েছে, ঘর হয়েছে।
কিন্তু দেশে ফিরে দেখলেন—
জমি নিয়ে ভাইদের সঙ্গে বিরোধ, সন্তানদের সাথে সম্পর্ক ঠাণ্ডা,
এমনকি নিজের থাকার জায়গাও নিশ্চিত নয়।
তিনি বলেন,
“আমি দেশের জন্য, পরিবারের জন্য সব দিলাম—কিন্তু শেষে আমার নিজের জন্য কিছুই রইল না।”
এই পরিস্থিতি হঠাৎ করে তৈরি হয় না। এর পেছনে কয়েকটি গভীর কারণ আছে—
পরিকল্পনার অভাব: অধিকাংশ প্রবাসী ভবিষ্যতের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করেন না
সঞ্চয়ের অভাব: সব টাকা পরিবারে পাঠানো হয়, নিজের জন্য কিছু রাখা হয় না
পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা: দীর্ঘদিন দূরে থাকার কারণে সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে
সামাজিক নিরাপত্তার অভাব: দেশে ফিরে প্রবাসীদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা নেই
এটি শুধু খাবারের কথা নয়।
এটি একটি ন্যূনতম সম্মানজনক জীবনের দাবি।
প্রবাসীরা বলতে চাচ্ছেন—
“আমরা বিলাসিতা চাই না, আমরা শুধু চাই—
শেষ জীবনে যেন অনাহারে না থাকতে হয়,
একটু শান্তিতে বাঁচতে পারি,
মানবিক মর্যাদা নিয়ে মৃত্যুবরণ করতে পারি।”
এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে ব্যক্তি, পরিবার এবং রাষ্ট্র—সব পর্যায়ে উদ্যোগ নিতে হবে।
১. প্রবাসীদের জন্য পরিকল্পিত সঞ্চয় ব্যবস্থা
বিদেশে থাকাকালীন বাধ্যতামূলক বা উৎসাহভিত্তিক সঞ্চয় স্কিম চালু করা যেতে পারে।
২. সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ
দেশে ফিরে প্রবাসীদের জন্য পেনশন বা ভাতা ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
৩. সচেতনতা বৃদ্ধি
প্রবাসীদের শুরু থেকেই জানাতে হবে—
সব টাকা পাঠিয়ে দিলে নিজের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে যাবে।
৪. পারিবারিক দায়িত্ববোধ তৈরি
পরিবারের সদস্যদেরও বুঝতে হবে—
প্রবাসীর ত্যাগ শুধু অর্থ নয়, এটি একটি জীবন উৎসর্গ।
প্রবাসীরা কোনো দান চাইছেন না, কোনো করুণা চাইছেন না।
তারা শুধু চাইছেন—তাদের জীবনের শেষ অধ্যায়টা যেন কষ্টে না কাটে।
অ্যাডভোকেট এ এন এম ঈসার এই আহ্বান আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়—
একটি জাতি হিসেবে আমরা কি আমাদের সেই মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াতে পারবো,
যারা নিজেদের জীবন বিসর্জন দিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল রেখেছে?
আজ সময় এসেছে—
প্রবাসীদের শুধু “রেমিটেন্স পাঠানো মেশিন” হিসেবে না দেখে,
তাদের মানুষ হিসেবে, যোদ্ধা হিসেবে, সম্মানের সঙ্গে মূল্যায়ন করার।
কারণ,
যে মানুষটি সারাজীবন দেশের জন্য দিয়েছে—
তার শেষ চাওয়াটা খুব ছোট—
“চারটা ডাল-ভাত খেয়ে শান্তিতে মরতে চাই।”
প্রেস বিজ্ঞপ্তিদাতা;
“দেশবন্ধু” রেমিটেন্স যুদ্ধা সংসদের প্রতিষ্ঠাতা এবং কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট এ এন এম ঈসা.
desh.bondhu@hotmail.com
এবং
এম এ রউফ (Qatar)
সদস্য সচিব কেন্দ্রীয় কমিটি.
00974 66958035.
Leave a Reply