• বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ০৫:০১ পূর্বাহ্ন
Headline
তীব্র তাপদাহে বিপর্যস্ত গাইবান্ধার জনজীবন : আখের রসে পিপাসা নিবারণের চেষ্টা বেতনের হিসাব মিলছে না সম্পদের পাহাড়ের সঙ্গে: এনবিআর কর্মকর্তার নামে-বেনামে ৪০০ কোটির বেশি সম্পদের অনুসন্ধান চায়ের কাপে চেয়ারম্যানি নয়, রায় দেবে জনগণ বুড়িচংয়ে নুরুল ইসলাম (আবদুল হক মাস্টার) চেয়ারম্যান স্মৃতি শিক্ষা ফাউন্ডেশন এর বৃত্তি সনদ প্রদান অনুষ্ঠিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে সাংবাদিকদের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ ঢাকা মেট্রোপলিটন ক্রাইম রিপোর্টার্স সোসাইটি গাজীপুরে সাংবাদিক অপহরণ ও নির্যাতনের অভিযোগ: বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ, ক্যামেরা-নগদ টাকা লুট; গ্রেপ্তার- ৫ গাইবান্ধায় বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণার অভিযোগ: গণঅধিকার পরিষদের জেলা সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে আইনি নোটিশ ডিবিসি’র শাফায়েতের কবলে নারী উপস্থাপিকারা, পরকীয়ায় অভিযোগ তদন্তে দোষী প্রমাণিত হয়ে চাকুরিচ্যুত ছাতকে বসেছে ইজারা বহির্ভূত পশুর হাট, রাজস্ব হারালো সরকার জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক–২০২৬: নরসিংদীর শ্রেষ্ঠ ইউএনও আসমা জাহান সরকার

বেতনের হিসাব মিলছে না সম্পদের পাহাড়ের সঙ্গে: এনবিআর কর্মকর্তার নামে-বেনামে ৪০০ কোটির বেশি সম্পদের অনুসন্ধান

Reporter Name / ৪৩ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬

 

বসুন্ধরায় শতকোটির ভবন, ঢাকাজুড়ে ৫৩ ফ্ল্যাট, পূর্বাচলে ছয় প্লট, মধুমতিতে বাংলোবাড়ি ও শতকোটির জমি; সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন, অনুসন্ধানের দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একজন কর্মকর্তা হিসেবে দীর্ঘ কর্মজীবন। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব প্রশাসনে দায়িত্ব পালন করেছেন বছরের পর বছর। কিন্তু সেই চাকরিজীবনের সম্ভাব্য আয় ও তার নামে-বেনামে গড়ে ওঠা সম্পদের হিসাব মেলাতে গিয়ে বিস্মিত হচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এনবিআরের ১৩তম ব্যাচের কর্মকর্তা সহিদুল ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে রাজধানী ঢাকা এবং আশপাশের এলাকায় ৪০০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৫৩টি ফ্ল্যাট, একাধিক বহুতল ভবন, অন্তত ২০টি প্লট, বাণিজ্যিক দোকান, শেয়ারবাজারে বিপুল বিনিয়োগ এবং বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

সম্পদের পরিমাণ ও প্রকৃতি নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশাসনিক মহল এবং দুর্নীতিবিরোধী মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন—একজন সরকারি কর্মকর্তার চাকরিজীবনের বৈধ আয়ের সঙ্গে এত বিপুল সম্পদের সামঞ্জস্য কোথায়?

বসুন্ধরায় ‘শেল কবিতা’: শতকোটির ভবন

রাজধানীর অভিজাত বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার জি ব্লকে ‘শেল কবিতা’ নামে ১০ তলা একটি ভবনের মালিক সহিদুল ইসলাম ও তার স্ত্রী। ভবনটিতে প্রতি তলায় দুটি করে মোট ২০টি ফ্ল্যাট রয়েছে।

এলাকার একাধিক রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিটি ফ্ল্যাটের বর্তমান বাজারমূল্য গড়ে পাঁচ কোটি টাকার কম নয়। সেই হিসাবে ভবনটির ফ্ল্যাটগুলোর সম্মিলিত মূল্যই প্রায় ১০০ কোটি টাকা। জমির মূল্য ও অন্যান্য অবকাঠামোগত ব্যয় যুক্ত করলে প্রকৃত বাজারমূল্য আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বর্তমানে এই ভবনেই বসবাস করছেন সহিদুল দম্পতি।

রাজধানীজুড়ে আরও ৩৩ ফ্ল্যাট

অনুসন্ধানে বসুন্ধরার বাইরে মিরপুর, বাংলামোটর, ইস্কাটন ও ইস্টার্ন হাউজিং এলাকায় সহিদুল ইসলাম, তার স্ত্রী ফাহমিদা রাব্বি এবং নিকট আত্মীয়দের নামে আরও ৩৩টি ফ্ল্যাটের তথ্য পাওয়া গেছে।

বাংলামোটরের স্বজন টাওয়ারে তার নিজ নামে দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে। ইস্কাটন গার্ডেন রোডের গার্ডেনিয়া টাওয়ারে রয়েছে আরও একটি উচ্চমূল্যের ফ্ল্যাট।

অন্যদিকে মিরপুরের রূপনগর আরামবাগ আবাসিক এলাকায় স্ত্রী ফাহমিদা রাব্বির নামে একটি ছয়তলা ভবনের তথ্য পাওয়া গেছে, যেখানে ১০টি ফ্ল্যাট রয়েছে। বাজারমূল্যে যার মূল্য কয়েক দশ কোটি টাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইস্টার্ন হাউজিংয়ে ভবন, জমি ও আত্মীয়দের নামে মালিকানা

মিরপুর ইস্টার্ন হাউজিং দ্বিতীয় প্রকল্পে ফাহমিদা রাব্বির নামে নির্মিত একটি ছয়তলা ভবনের তথ্য মিলেছে। পরে ভবনটি চার শ্যালকের নামে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে দেখা যায়।

এছাড়া একই এলাকায় একাধিক প্লট, শিল্পকারখানা হিসেবে ভাড়া দেওয়া জমি এবং বাণিজ্যিক ব্যবহারে থাকা সম্পত্তিরও তথ্য পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত হিসাব অনুযায়ী, সহিদুল, তার স্ত্রী এবং আত্মীয়স্বজনদের নামে থাকা ৫৩টি ফ্ল্যাট ও দুটি বাণিজ্যিক দোকানের সম্মিলিত বাজারমূল্য অন্তত ১৬২ কোটি টাকা।

নিউমার্কেট ও আজিজ সুপার মার্কেটে বাণিজ্যিক সম্পদ

রাজধানীর আজিজ সুপার মার্কেট এবং নিউমার্কেটে সহিদুল ইসলামের নামে দুটি দোকানের মালিকানার তথ্য পাওয়া গেছে।

বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী দোকান দুটির সম্মিলিত মূল্য চার কোটি টাকারও বেশি বলে জানা গেছে।

মধুমতিতে বাংলোবাড়ি ও ৯০ কোটির জমি

ঢাকার অদূরে সাভারের মধুমতি মডেল টাউনে ‘সেঁজুতি’ নামে একটি বাংলোবাড়ির মালিক সহিদুল ইসলাম। ৩৫ কাঠা জমির ওপর নির্মিত বাড়িটি স্থানীয়ভাবে আলোচিত।

এছাড়া একই প্রকল্পে তার মালিকানায় আরও পাঁচটি প্লটের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব প্লটে গ্যারেজ, ভারী যন্ত্রপাতির ডিপো এবং গবাদিপশুর খামার পরিচালিত হচ্ছে বলে জানা গেছে।

বর্তমান বাজারমূল্যে এসব জমির সম্মিলিত মূল্য অন্তত ৯০ কোটি টাকা বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করছে।

পূর্বাচলে ছয় প্লট, মূল্য ৬২ কোটির বেশি

অনুসন্ধানে পূর্বাচলের বিভিন্ন মৌজায় সহিদুল ইসলাম ও তার স্ত্রীর নামে ছয়টি প্লটের তথ্য উঠে এসেছে।

পিংক সিটি, পিতলগঞ্জ, দিঘলিয়া, বাড়িয়াছনি, মুশুরীগ্রাম ও কামতা মৌজায় অবস্থিত এসব জমির বর্তমান বাজারমূল্য ৬২ কোটিরও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শেয়ারবাজারে ৮০ কোটি টাকার বিনিয়োগ

স্থাবর সম্পদের পাশাপাশি অস্থাবর সম্পদেও বিপুল বিনিয়োগের তথ্য মিলেছে।

ফাহমিদা রাব্বির নামে একটি বিও অ্যাকাউন্টে প্রায় ৮০ কোটি টাকার শেয়ার রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে। এছাড়া ব্যাংক হিসাবেও উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ জমা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।

ছেলের নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান

সহিদুল ইসলামের ছেলে হাসিন ফারহানের নামে বসুন্ধরার একটি বাণিজ্যিক ভবনে একাধিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক বিনিয়োগে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এসব বিনিয়োগের উল্লেখযোগ্য অংশ পারিবারিক উৎস থেকেই এসেছে।

আয় বনাম সম্পদ: উত্তরহীন প্রশ্ন

একই ক্যাডারের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দীর্ঘ চাকরিজীবনে একজন প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা বেতন, ভাতা, পেনশন, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও অন্যান্য সুবিধা মিলিয়ে সর্বোচ্চ কয়েক কোটি টাকার সম্পদ গড়তে পারেন।

সেখানে সহিদুল ইসলাম ও তার পরিবারের নামে শত শত কোটি টাকার সম্পদের তথ্য সামনে আসায় সম্পদের উৎস নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তার অধিকাংশ সম্পত্তি ২০১০ সালের পর অর্জিত হয়েছে। ফলে ওই সময়ে সম্পদের উৎস, আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী এবং আর্থিক লেনদেনের বিষয়গুলো তদন্তের দাবি উঠেছে।

বক্তব্য দিতে অনাগ্রহ

অভিযোগ ও সম্পদের উৎস সম্পর্কে বক্তব্য জানতে একাধিকবার সহিদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি কোনো সাড়া দেননি।

স্ত্রী ফাহমিদা রাব্বির সঙ্গেও যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

টিআইবির অনুসন্ধানের আহ্বান:

এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা উচিত।

তার মতে, সম্পদের উৎস, কর নথি এবং আর্থিক লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অন্যথায় দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান ও জবাবদিহিতার প্রশ্নে নেতিবাচক বার্তা যেতে পারে।

এখন প্রশ্ন একটাই- একজন সরকারি কর্মকর্তার সম্ভাব্য আয়ের সীমা যেখানে কয়েক কোটি টাকার মধ্যে, সেখানে ৪০০ কোটিরও বেশি সম্পদের উৎস কী? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে সংশ্লিষ্ট মহল, আর সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে অভিযোগের সত্যতা ও পরবর্তী পদক্ষেপের পথ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা