নিয়োগ জালিয়াতি, সরকারি নথি টেম্পারিং, এমপিও অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে তদন্তে অসঙ্গতি; বেতন বন্ধের পরও বহাল অধ্যক্ষকে ঘিরে বাড়ছে প্রশ্ন!
নিজস্ব প্রতিবেদক নওগাঁ:
নওগাঁ জেলার নিয়ামতপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বালাতৈড় সিদ্দিক হোসেন ডিগ্রি কলেজে দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ জালিয়াতি, সরকারি নথি টেম্পারিং, এমপিও-সংক্রান্ত অনিয়ম, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। সংশ্লিষ্ট অভিযোগ, শুনানির কার্যবিবরণী এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)-এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অভিযোগের তদন্ত শেষে অধ্যক্ষ ড. মো. আমজাদ হোসেনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত একাধিক অনিয়মের বিষয় প্রতীয়মান হওয়ায় জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২১-এর ১৭.৯ এবং ১৮.১ (গ) ও (ঙ) ধারার আলোকে তাঁর এমপিও বেতন স্থগিত (Stop Payment) করা হয়।
তবে সরকারি এ সিদ্ধান্তের পরও অধ্যক্ষ ড. মো. আমজাদ হোসেন কীভাবে এখনো বহাল থেকে কলেজ পরিচালনা করছেন, তা নিয়ে কলেজজুড়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের সদস্য এবং স্থানীয় সচেতন মহলের মধ্যে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। তাদের প্রশ্ন—একজন অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে তদন্তে অনিয়মের বিষয় উঠে আসা এবং এমপিও বেতন স্থগিত হওয়ার পরও কেন তাঁর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি?
অভিযোগকারী পক্ষের ভাষ্য, দীর্ঘদিন অধ্যক্ষ আমজাদ হোসেন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের ঘনিষ্ঠ আস্থাভাজন হিসেবে এলাকায় পরিচিত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, সেই রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তৎকালীন কলেজ গভর্নিং বডির কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সহযোগিতায় কলেজ প্রশাসনে দীর্ঘদিন একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করা হয়। তবে এ বিষয়ে অধ্যক্ষ বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এই প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময় পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ অনুযায়ী, বৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক মো. এরশাদ আলীর এমপিও আবেদন নিষ্পত্তির সময় কলেজ গভর্নিং বডির মূল রেজুলেশন পরিবর্তন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ পরিদর্শক ও ডিজি প্রতিনিধির স্বাক্ষর টেম্পারিং, নিয়োগ বোর্ড-সংক্রান্ত নথিতে অসঙ্গতি সৃষ্টি এবং সরকারি কাগজপত্র বিকৃতির মতো অভিযোগ তদন্তে উঠে আসে। পরবর্তীতে মাউশি সংশ্লিষ্টদের লিখিত ব্যাখ্যা আহ্বান করলেও তা সন্তোষজনক না হওয়ায় অধ্যক্ষের এমপিও বেতন স্থগিত করা হয়।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, তদন্তে উত্থাপিত অনিয়মের পরও কলেজে তাঁর বিরুদ্ধে কার্যকর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। বরং তিনি পূর্বের মতোই প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে অভিযোগকারী শিক্ষক প্রভাষক মো. এরশাদ আলীকে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করতে বাধা দেওয়া, নিয়মিত পাঠদান থেকে বিরত রাখার চেষ্টা, অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষার্থী ভর্তি নিরুৎসাহিত করা এবং বিভিন্নভাবে প্রশাসনিক হয়রানির অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে।
এদিকে কলেজের কৃষিজমি, পুকুর, আমবাগান, কাঠের বাগান, মার্কেটসহ বিভিন্ন আয়বর্ধক সম্পদ থেকে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ আয় হলেও তার সুষ্ঠু হিসাব ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী। অভিযোগ রয়েছে, এসব বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে এবং বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।
প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের সদস্য, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, মাউশির তদন্তে অনিয়মের বিষয় প্রতীয়মান হওয়া এবং এমপিও বেতন স্থগিত হওয়ার পর একই অভিযোগের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ বিভাগীয় তদন্ত সম্পন্ন করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। একই সঙ্গে বৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রভাষক মো. এরশাদ আলীর ২০১৯ সালের জুন-জুলাই থেকে বকেয়া বেতন-ভাতা দ্রুত পরিশোধ এবং তাঁর প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
(চলবে… দ্বিতীয় পর্বে: নিয়োগ বোর্ড, গভর্নিং বডির রেজুলেশন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নথি, ডিজি প্রতিনিধির স্বাক্ষর টেম্পারিং এবং এমপিও-সংক্রান্ত অভিযোগের নথিভিত্তিক বিশ্লেষণ।)