এম এ মমিন আনসারী:
“আমরা খাওয়ার জন্য বাঁচি না, বাঁচার জন্য খাই।”
কথাটি বহুবার শুনেছি। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে যেন এর উল্টো চিত্র। আমরা বাঁচার জন্য খেতে বসি, অথচ অজান্তেই প্রতিদিন একটু একটু করে মৃত্যুকে আমন্ত্রণ জানাই।
আমাদের প্রতিদিনের খাবারের প্লেটে এখন শুধু খাদ্য নয়, ঢুকে পড়েছে ভেজাল, বিষাক্ত রাসায়নিক আর প্রতারণা।
সকালের রুটিতে নিম্নমানের আটা, দুধে ভেজাল, মসলায় কৃত্রিম রং, ফলে কার্বাইড, মাছ-মাংসে ক্ষতিকর রাসায়নিক, সবজিতে অতিরিক্ত কীটনাশক—এ যেন নিত্যদিনের বাস্তবতা। এমনকি টুথপেস্ট, শিশুখাদ্য, প্রসাধনী থেকে শুরু করে ওষুধ পর্যন্ত নকল ও নিম্নমানের পণ্যের অভিযোগ রয়েছে।
আমরা কি সত্যিই খাবার খাচ্ছি, নাকি ধীরে ধীরে বিষ গ্রহণ করছি?
ভেজাল শুধু খাদ্যে নয়, বিবেকেও
আজ শুধু বাজারের খাবার নয়, সমাজের নৈতিকতাও যেন ভেজালে আক্রান্ত।
মুনাফার লোভে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী মানুষের জীবন নিয়ে খেলছে। কোথাও দায়িত্বহীনতা, কোথাও দুর্বল তদারকি, কোথাও আইনের প্রয়োগে শৈথিল্য—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষ যেন অসহায়।
হোটেলের খাবার দেখতে আকর্ষণীয়, কিন্তু তার মান কতটা নিরাপদ—ভোক্তা জানেন না। বাজারে গিয়ে মানুষ পণ্যের বিশুদ্ধতার নিশ্চয়তা পান না। ধীরে ধীরে পারস্পরিক বিশ্বাসও কমে যাচ্ছে।
হাসপাতাল ভর্তি হচ্ছে, কিন্তু কারণ লুকিয়ে আছে আমাদের প্লেটে
ক্যানসার, কিডনি রোগ, লিভারের জটিলতা, হরমোনজনিত সমস্যা, ডায়াবেটিস—এসব অসংক্রামক রোগ আগের তুলনায় অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে। এর পেছনে খাদ্যাভ্যাস, পরিবেশ, জীবনযাত্রা এবং খাদ্যের নিরাপত্তাসহ নানা কারণ কাজ করে বলে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন।
যখন খাদ্যের নিরাপত্তা নিয়েই মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়, তখন জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নটি আর ব্যক্তিগত থাকে না—এটি জাতীয় সংকটে পরিণত হয়।
দায় এড়ানোর সুযোগ কারও নেই
শুধু অসাধু ব্যবসায়ীদের দোষ দিলেই দায় শেষ হয় না।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আরও কার্যকর হতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত নজরদারি, মান নিয়ন্ত্রণ ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে ভোক্তা হিসেবেও আমাদের দায়িত্ব রয়েছে। পণ্যের মোড়ক, উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ দেখা, সন্দেহজনক পণ্য বর্জন করা এবং অনিয়ম দেখলে অভিযোগ জানানো—এসব অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
সমাধান শুরু হোক আমাদের ঘর থেকেই
ভেজালের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু সরকারের একার নয়; এটি পুরো সমাজের দায়িত্ব।
– নিরাপদ ও বিশ্বস্ত উৎস থেকে খাদ্য কিনুন।
– ফল, সবজি ও মাছ-মাংস ভালোভাবে পরিষ্কার করে ব্যবহার করুন।
– সম্ভব হলে বাড়িতে কিছু মৌসুমি শাকসবজি চাষ করুন।
– ভেজাল বা নকল পণ্য সম্পর্কে সচেতনতা ছড়িয়ে দিন।
– অনিয়ম দেখলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানান এবং সামাজিকভাবে প্রতিবাদ গড়ে তুলুন।
শেষ কথা
একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিশুদের সুস্বাস্থ্য, মেধা ও কর্মক্ষমতার ওপর। আমরা যদি আজ নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হই, তাহলে আগামী প্রজন্ম তার মূল্য দেবে।
এটি শুধু খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, নৈতিকতা এবং জাতীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন।
আসুন, আমরা প্রত্যেকে প্রতিজ্ঞা করি—নিজে নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ করব, অন্যকেও নিরাপদ খাদ্যের অধিকার নিশ্চিত করতে সচেতন করব।
নিজে বাঁচি, পরিবারকে বাঁচাই, দেশকে বাঁচাই।
নিরাপদ খাদ্য হোক প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার।
লেখক:
এম এ মমিন আনসারী
চেয়ারম্যান
সামাজিক ভোক্তা অধিকার সুরক্ষা সোসাইটি।