এম এ মমিন আনসারী:
বাংলাদেশের বাজারে বিক্রিত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়ার তথ্য জনস্বাস্থ্য, ভোক্তা অধিকার এবং পরিবেশ সুরক্ষার ক্ষেত্রে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত পরীক্ষার তথ্যে ২৬টি টুথপেস্টে বিভিন্ন মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত হওয়ার দাবি সামনে এসেছে। দাঁত পরিষ্কারের মতো দৈনন্দিন ব্যবহারের একটি পণ্যে এ ধরনের উপাদান থাকার বিষয়টি সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা, যা পরিবেশে দীর্ঘদিন টিকে থাকে। বিভিন্ন গবেষণায় মানবদেহ, নদী-সমুদ্র, মাছ, খাদ্য ও পানীয়তে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির তথ্য উঠে এসেছে। যদিও টুথপেস্টে পাওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিকের স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন, তবুও অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক উপাদান ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করার পক্ষে বিশ্বজুড়েই জোরালো মত রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টুথপেস্টে যদি ইচ্ছাকৃতভাবে প্লাস্টিকভিত্তিক কণা ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তবে তা দ্রুত বন্ধ করা উচিত। একই সঙ্গে বাজারে থাকা সব ব্র্যান্ডের টুথপেস্টের নমুনা সংগ্রহ করে স্বীকৃত পরীক্ষাগারে পুনরায় পরীক্ষা করা জরুরি। পরীক্ষার ফলাফল জনসম্মুখে প্রকাশ করা হলে ভোক্তারা সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের করণীয়
১. দেশের বাজারে বিক্রিত সব টুথপেস্টের নমুনা জরুরি ভিত্তিতে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা।
২. পরীক্ষার ফলাফল সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রকাশ করা।
৩. যেসব প্রতিষ্ঠানের পণ্যে ক্ষতিকর মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক বা নিষিদ্ধ উপাদান পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ।
৪. বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই), ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সমন্বয়ে যৌথ তদারকি জোরদার করা।
৫. টুথপেস্ট উৎপাদনে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ বাধ্যতামূলক করা এবং কাঁচামালের উৎস নিয়মিত যাচাই করা।
৬. ভোক্তাদের জন্য সচেতনতামূলক প্রচারণা চালিয়ে পণ্যের উপাদান সম্পর্কে জানার অভ্যাস গড়ে তোলা।
প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব
প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের ব্যবহৃত কাঁচামাল ও উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে স্বাধীন পরীক্ষাগারে পণ্যের মান পরীক্ষা করিয়ে সেই প্রতিবেদন প্রকাশ করা উচিত। নিরাপদ বিকল্প উপাদান ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব পণ্য উৎপাদনের উদ্যোগ গ্রহণও সময়ের দাবি।
ভোক্তাদের করণীয়
ভোক্তাদের উচিত বিএসটিআই অনুমোদিত ও মানসম্মত পণ্য ব্যবহার করা, পণ্যের লেবেল ও উপাদান সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং সন্দেহজনক পণ্য সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা।
উপসংহার
জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নে কোনো ধরনের অবহেলার সুযোগ নেই। টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি সম্পর্কিত অভিযোগ দ্রুত, নিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা এখন সময়ের দাবি। সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, গবেষক ও ভোক্তা—সবার সম্মিলিত উদ্যোগেই নিরাপদ ও মানসম্মত ভোগ্যপণ্য নিশ্চিত করা সম্ভব। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় স্বচ্ছ তদন্ত, কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ এবং কার্যকর নজরদারিই হতে পারে এই উদ্বেগের টেকসই সমাধান।