নীলফামারী সদর উপজেলার গোড়গ্রাম ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের গ্রাম পুলিশ (চৌকিদার) মোঃ মিনহাজুল ইসলাম মিনহাজকে ঘিরে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিভিন্ন ভাতা পাইয়ে দেওয়ার নামে দীর্ঘদিন ধরে দরিদ্র, অসহায় ও নিম্নআয়ের মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগে এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র, ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসীর অভিযোগ অনুযায়ী, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা, জন্ম নিবন্ধন সংশোধনসহ বিভিন্ন সরকারি কাজ করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অসংখ্য মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন মিনহাজ। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিশ্রুত সেবা মেলেনি। বরং দিনের পর দিন নানা অজুহাতে ঘুরানো হয়েছে ভুক্তভোগীদের।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, সরকারি সহায়তা পাওয়ার আশায় ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার সাধারণ মানুষ মিনহাজের কাছে টাকা দিতে বাধ্য হয়েছেন। কেউ ধার করে, কেউ আবার সুদে টাকা এনে তার হাতে তুলে দিয়েছেন। কিন্তু টাকা দেওয়ার পরও প্রতিশ্রুত ভাতার কার্ড বা সরকারি সুবিধা না পাওয়ায় এখন তারা হতাশ ও ক্ষুব্ধ। স্থানীয়দের অভিযোগ, একজন গ্রাম পুলিশ হয়েও মিনহাজ নিজেকে প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং কখনো “এসপি” পরিচয়ে উপস্থাপন করতেন। এই প্রভাব ও ভয়ভীতি ব্যবহার করে পুরো ইউনিয়নে সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে গড়ে তোলেন অর্থ বাণিজ্যের একটি প্রভাবশালী চক্র। অভিযোগ রয়েছে, গোড়গ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক মোঃ আলমগীর হোসেনের ঘনিষ্ঠ পরিচয় ব্যবহার করে তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিজের প্রভাব বিস্তার করেছেন এবং অবাধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি চালিয়ে গেছেন।
ভুক্তভোগী জাকারিয়া ইসলাম বলেন, আমার স্ত্রীর মাতৃত্বকালীন ভাতার কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে মিনহাজ সাড়ে ৪ হাজার টাকা নিয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো কার্ড হয়নি। এখন শুধু সময়ক্ষেপণ করছে, রাহাত ইসলাম অভিযোগ করে বলেন আমার মায়ের বিধবা ভাতার কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে ৩ হাজার ৫০০ টাকা নিয়েছে। শুধু আমাদের কাছ থেকেই নয়, এলাকার আরও বহু মানুষের কাছ থেকেই টাকা নিয়েছে। কিন্তু কেউ কোনো সুবিধা পায়নি। এছাড়াও শামসুন্নাহার, লতিফা বেগম ও লাভলী বেগমসহ একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে ভাতার কার্ডের নামে টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসীর দাবি, এভাবে প্রায় ৪ লাখ টাকারও বেশি হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। হাকিম চৌধুরী ফেসবুকে মন্তব্য করেন সঠিক তদন্ত করার পরে আইনের আওতায় এনে বিচার করা হোক, কৃষ্ণ রায় লিখেছেন সঠিক তদন্ত সাপেক্ষে বিচারের আওতায় আনা হোক, মিজানুর রহমান মন্তব্য করেন এই গ্রাম পুলিশের বরখাস্ত চাই, ইমরান ইসলাম অভিযোগ করে লিখেছেন আমাদের গ্রাম থেকেও ৫ হাজার টাকা খাইছে, আমাদের বাসা থেকে ২ হাজার নিয়েছে, শাহীন নামের একজন মন্তব্য করেন এটা একটা চরম অন্যায়। তদন্তের মাধ্যমে বিচারের আওতায় আনা হোক, রুবাইয়েদ ইসলাম লিখেছেন সঠিক তদন্ত করার পরে আইনের আওতায় এনে বিচার করা হোক, লিখন ইসলাম বলেন অতি দ্রুত আইনের আওতায় আনা হোক, জোহান সরকার মন্তব্য করেন ভাব দেখলে মনে হয় প্রধানমন্ত্রী, কিন্তু সে জানে না যে সে একজন গ্রাম পুলিশ, হাকিম চৌধুরী আরও লেখেন আরো বানাও চৌকিদার, আর বেশি করে খাক মানুষের টাকা। লোভ মানুষকে ধ্বংস করে দেয়, এটাই বাস্তব, ইবলাম তামিম বলেন আমাদের নয় নম্বর ওয়ার্ডের এসপি, শহিদুল ইসলাম শহীদ মন্তব্য করেন একজন চৌকিদার হয়ে এই অবস্থা! ঘটনা যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি, জাহাঙ্গীর আলম বলেন আমিও একজন ভুক্তভোগী, মাসুদ রানা অভিযোগ করে বলেন আমার জন্ম নিবন্ধন স্মার্ট করার কথা বলে আমার বাবার কাছ থেকে ১২০০ টাকা তিন মাস আগে নিয়েছে। এখনো জন্ম নিবন্ধন দেয়নি গ্রাম পুলিশ।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদকেন্দ্রিক বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করে মিনহাজ দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব একটি বলয় গড়ে তুলেছিলেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগ থাকলেও প্রভাবশালী মহলের কারণে অনেকে মুখ খুলতে সাহস পাননি।
এছাড়াও আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এলাকাবাসীর দাবি, সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তিনি বিভিন্ন নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতেন। স্থানীয় কিছু মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে অর্থের বিনিময়ে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি অবৈধ জুয়া ও ক্যাসিনো সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছেন কেউ কেউ। একজন গ্রাম পুলিশ সদস্যের দায়িত্ব সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সহযোগিতা করা এবং জনসেবামূলক কাজে অংশ নেওয়া। অথচ সেই দায়িত্বকে পুঁজি করে যদি দরিদ্র মানুষের সঙ্গে প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ ও প্রভাব বিস্তারের মতো কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের রাষ্ট্রীয় সেবার প্রতি আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। শুক্রবার (১৫ মে ২০২৬) বিকেলে কয়েকজন ভুক্তভোগী টাকা ফেরত ও জবাবদিহি চাইতে মিনহাজের বাড়িতে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত এবং ভুক্তভোগীদের টাকা ফেরতের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা। তবে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হওয়ার পরও প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ, উদ্বেগ ও প্রশ্ন।